এই সূরা মরণাপন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠ করলে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায় !

পরকালভীতিই মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই দেহের সুস্থতা যেমন অন্তরের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল তেমনি ঈমানের সুস্থতা পরকালের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল (রুহুলমায়ানি)। এ সূরার নাম সূরা ইয়াসিন হিসেবে প্রসিদ্ধ; তবে হাদিসে এ সূরার নাম ‘আজিমা’ও বর্ণিত আছে। অপর এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তাওরাতে এ সূরার নাম ‘মুয়িম্মাহ’ বলে উল্লেখ আছে।

অর্থাৎ এ সূরা তার পাঠকারীকে ইহকাল ও পরকালে শান্তি ও ব্যাপক কল্যাণ এনে দেয়। অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, এ সূরা কেয়ামতের দিন অধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সুপারিশকারী হবে এবং তা আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন।
আবার এ সূরার নাম ‘মুদাফিয়া’ও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ এ সূরা তার পাঠকদের থেকে বালা-মুসিবত দূর করে। অন্য রেওয়ায়েতে এর নাম ‘কাজিয়া’ও উল্লিখিত হয়েছে; অর্থাৎ এ সূরা পাঠকের সব ধরনের প্রয়োজন মেটায়। (রূহুলমায়ানি)
হজরত আবু যর রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-এর কাছ থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন, মরণোন্মুখ ব্যক্তির কাছে সূরা ইয়াসিন পাঠ করলে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায়। (মাজহারি)

সুরা ইয়াসিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের প্রথম দিকে এবং হিজরতের বহু আগে মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা ৮৩, রুকু পাঁচটি। সুরাটিকে ‘কলবুল কোরআন’ বা কোরআনের অন্তঃকরণ বলা হয়। বাস্তবিকই এ সুরায় কোরআনিক শিক্ষার প্রাণবস্তু তাওহিদ, রিসালাত, হিদায়াত, নবুয়ত এবং ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা রয়েছে। ইয়াসিন শব্দের অর্থ ‘হে মানব’ মতান্তরে ‘হে মুহাম্মদ (সা.)’।

হাদীস শরীফে রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘সূরা ইয়াসিন কুরআনের হৃদয়। ’যে ব্যক্তি সূরা ইয়াসিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের কল্যাণ লাভের জন্য পাঠ করবে তার মাগফিরাত হয়ে যায়। তোমরা তোমাদের মৃতদের জন্য এ সূরা তিলাওয়াত করো। (রুহুলমায়ানি, মাজহারি)

ইমাম গাজ্জালী (রহ:) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সূরা ইয়াসিনকে কুরআনের হৃদয় এ কারণে বলা হয়েছে যে, ‘এ সূরায় কেয়ামত ও হাশর-নশর বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা ও অলঙ্কারসহকারে বর্ণিত হয়েছে। পরকালে বিশ্বাস ঈমানের এমন একটি মূলনীতি, যার ওপর মানুষের সব আমল ও আচরণের বিশুদ্ধতা নির্ভরশীল। পরকালের ভয়ভীতি মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই দেহের সুস্থতা যেমন অন্তরের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল তেমনি ঈমানের সুস্থতা পরকালের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল (রুহুলমায়ানি)।

তিরমিজী শরীফে উল্লেখ রয়েছে, সুরা ইয়াছিন একবার পাঠ করলে দশবার কোরআন খতম করার নেকী হয় এবং পাঠকের সব গুনাহ মাফ হয়। হাদীসে আরো বলা হয়েছে, রাতে সুরা ইয়াছিন পাঠ করলে নিস্পাপ অবস্থায় ঘুম থেকে উঠা যায় এবং পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি সুরা ইয়াছিন বেশী বেশী পড়ে থাকে কেয়ামতের দিন এই সুরাই তার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। নবী করিম (সাঃ) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত সুরা ইয়াছিন পাঠ করবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে।
ফাইল ছবি

হজরত আবু যর (রা:) বলেন, আমি রাসূল সা:-এর কাছ থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন, মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তির কাছে সূরা ইয়াসিন পাঠ করলে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায়। (মাজহারি)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা: বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি সূরা ইয়াসিন অভাব-অনটনের সময় পাঠ করে তাহলে তার অভাব দূর হয়, সংসারে শান্তি ও রিজিকে বরকত লাভ হয়। (মাজহারি)

ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখে-স্বস্তিতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় পাঠ করবে সে সকাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকবে (মাজহারি)। এছাড়াও সূরা ইয়াসিনের বহু ফজিলত হাদিসে বর্ণিত আছে, তাই আমাদের এই সূরাটি অর্থ সহ বুঝে পড়া ও আমল করা উচিত।

হক বা সত্যের উন্নতি ও অগ্রগতি কখনো ব্যাহত হয় না। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বেলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। জানা যায়, সব যুগের, সব নবী-রাসুলকেই সমসাময়িক কালের লোকদের দ্বারা দুঃখকষ্টে জর্জরিত হতে হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) আল্লাহর নির্দেশিত চিরন্তন সত্য-সুদৃঢ় পথে মানবজাতিকে পরিচালিত করতে গিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়েছেন, বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। যারা নবীজি (সা.)-এর বিরোধিতা করেছে তারা এর আগেও খ্রিস্টান, ইহুদি বা অন্য কোনো ধর্মের নীতিও মেনে চলেনি।

প্রবীণরা দীর্ঘদিনের অভ্যাস, সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস পরিত্যাগ করতে পারেনি। আর এসব মহাপাপী, অন্ধবিশ্বাসী ও হঠকারীদের সত্য ও ন্যায়ের প্রতি চরম বিরোধিতার কথাই এ সুরার প্রথমাংশে আলোচিত হয়েছে। এ সুরায় এমন এক জনপদের কথা বলা হয়েছে, যেখানে উপর্যুপরি তিনজন সতর্ককারী নবী প্রেরিত হওয়ার পরও এর অধিবাসীরা ধর্মের বাণীতে কর্ণপাত করেনি। যেকোনো সময় আল্লাহ তায়ালা যেকোনোটিই সৃষ্টি অথবা ধ্বংস করতে পারেন। সৃষ্টির জন্য যেমন কোনো সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি ধ্বংসের বেলায়ও আল্লাহর পক্ষে সময়ক্ষেপণের দরকার হয় না। সংস্কার-প্রচেষ্টার প্রতি মানুষের মনের স্বাভাবিক বিরোধপ্রবণতা অপরিসীম। নতুন বলতে যদি কোনো কিছু শাশ্বত, সুন্দর, সত্যের সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাহলে পুরনোকে পরাজয় বরণ করতে হয়। সুতরাং জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নারী-পুরুষের পক্ষে শুধু নতুন বলে কোনো মত বা পথের বিরোধিতা করা উচিত নয়।

সুরাটির প্রায় মাঝামাঝিতে সৃষ্টি সম্পর্কিত মানুষের অস্বচ্ছ ধারণা উদ্ঘাটিত হয়েছে। বলা হয়েছে, সব সৃষ্টিই যুগল সৃষ্টি। বস্তু-প্রাণী, অণু-পরমাণু ও জানা-অজানা সব কিছুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি সুরাটিতে মহাশূন্যে চন্দ্র-সূর্য উভয়ই নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করা ছাড়াও সূর্য নিজ মেরুতে ২৬ দিনে একবার ঘুরে আসে এ কথাও বলা হয়েছে। তা ছাড়া এ সুরায় প্রচণ্ড আঘাতে সারা পৃথিবী প্রকম্পিত হওয়া, সব মানুষ পুনরুজ্জীবিত হয়ে ময়দানে হাশরে সমবেত হওয়া, শান্তি বা পুরস্কার লাভ, বেহেশতের সুখ-ভোগ, নারী-পুরুষের কৃতকর্ম এবং নেকি-বদি প্রমাণের জবানবন্দি বা অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন না হওয়া, নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত দৈহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিজ নিজ ভূমিকা বর্ণনা করা, সামান্য শুক্রকণা থেকে একান্ত অসহায় মানব সৃষ্টির রহস্য এবং পরবর্তী সময়ে বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির অধিকারী হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে আরো বর্ণনা করা হয়েছে, নবী কখনো কবি বা কাব্যবিদ নন।

তাঁর বাণী শাশ্বত সত্যের ভাস্বর প্রকাশ। আর কোরআন, যাতে অতি সহজ-সরলভাবে ধর্মীয় মৌলিক নীতিগুলো বর্ণিত ও ব্যাখ্যায়িত হয়েছে। জড়বাদী কাফিরদের ব্যাপারেও সুরাটিতে আলোচনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমি আলোচনা দীর্ঘায়িত করব না। বলব, বান্দা এবং তাঁর সৃষ্টিকর্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ মাধ্যম বা সরল পথপন্থা নির্ধারণের বিষয়ে। এ বিষয়ে বলতে গেলে ইসলাম প্রতিটি মানুষকেই ব্যক্তিস্বাধীনতা দান করেছে। অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষই স্বাধীন।

আমরা জানি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য আজও মানুষ অবিচ্ছিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিস্বাধীনতা ইসলাম চৌদ্দ শ বছর আগেই স্বীকার করে নিয়েছে। অধ্যাত্মজগতের এই ব্যক্তিবাদ বস্তুজগতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। সর্বশেষ এই সুরার শেষাংশে জলবায়ু, আগুন ও আগুন তৈরির কলাকৌশল বর্ণিত হয়েছে। জলবায়ু পাওয়াটা সহজলভ্য হলেও আগুন মানুষকে তৈরি করে নিতে হয়। মানুষের আদি ও আসল বাসস্থান মধ্যপ্রাচ্য বা আরব, যেখানে পত্র-পল্লববিহীন শাখা-প্রশাখাযুক্ত এক ধরনের গাছ চোখে পড়ে।

প্রথমত এ গাছের দুই টুকরা ডালকে একটি অন্যটির খোদিত গর্তের ভেতর ঘুরিয়ে আরবীয়রা আগুন উৎপাদন করেছিল। আর এ যন্ত্রটির নাম ছিল ‘জিনাদ’। আজ এরই ধারাবাহিকতায় মানুষ কালক্রমে বাঁশে-বাঁশে, পাথরে-পাথরে, লৌহ-ইস্পাতে ঘর্ষণের সাহায্যে আগুন উৎপাদনের সহজ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছে। অতএব সবুজ গাছের পরস্পর শাখা থেকে যিনি আগুন উৎপাদন করতে সক্ষম, তিনি বা তাঁর পক্ষে প্রাণহীন দেহ বা অস্থি-কঙ্কাল থেকে মানুষকে আবার সৃষ্টি করা মোটেও অসম্ভব নয়। আমি সুরা ইয়াসিনের আলোচনাকে সারসংক্ষেপ করার হাজারো চেষ্টা করলেও এর প্রতিটি আয়াতই খুব ব্যাখ্যানির্ভর ও অনুধাবনযোগ্য।

এই সুরার নিত্য-আবৃত্তি ও মর্মকথা বোঝা সীমাহীন নেক কাজ। এর ভক্ত মুসলমানরা অতি বিশ্বাসের সঙ্গে আপতিত বিপদাপদ ও নানা দুঃখকষ্টে তা পাঠ করে হৃদয় বা মনে সাহস জোগানোর মাধ্যমে আল্লাহর অপার করুণা লাভের ভরসা করে থাকে। জীবনের শেষ সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন এই সুরা তিলাওয়াত করতে অসমর্থ হলেও অন্যের কণ্ঠে এর তিলাওয়াত শুনে আল্লাহর প্রেমে হৃদয় ভরে পরম বিশ্বাস ও ভক্তি সহকারে জীবন-বিধাতার চরম-প্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করে দেয়।

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন