ইসলামে কবি ও কাব্যচর্চার ঠাঁই আছে কি?

শিল্পের মহোত্তম শাখা কবিতা। কিন্তু কবি আর কবিতা লেখা নিয়ে কী বলছে ইসলাম? নাকচ করছে, নাকি সমর্থন করছে? তার আগে একটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এই লেখাটির পাঠকদের উদ্দেশে একটি প্রশ্ন করার পর, মূল লেখায় চলে যাব। প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন গাড়িচালক যদি মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালান এবং সেই গাড়িটি দুর্ঘটনা ঘটায়, তাহলে দোষ কার ওপর বর্তায়? ড্রাইভারের ওপর, নাকি গাড়ির প্রস্তুতকারক কোম্পানির ওপর?

উত্তর ঠিক করে নিন। এরই মধ্যে আমরা মূল কথায় আসি। তার আগে বলে নিই, ইসলাম ধর্মে কবিতাকে কতটা স্বাগত কিংবা তিরস্কৃত করা হলো, সেটি বর্ণনায় তথ্যসূত্র হিসেবে আমরা ব্যবহার করব আল-কোরআন ও আল হাদিস। কবি ও কবিতা লেখার বৈধতা কিংবা অবৈধতা সম্পর্কে আমরা খুঁজব আল্লাহ ও রাসুলের বাণী। ‘ধর্ম’কে বর্তমান যুগের ‘ধার্মিক’ দ্বারা বিচার নয়, আমরা চেষ্টা করব ধর্মকে ধর্মগ্রন্থ দ্বারা বিচার করতে।

কবিকে সমর্থন ও কবিতাকে স্বাগত জানানোর মতো বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে রাসুল (সা.)-এর জীবনে। সেসব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বোঝা যায় যে, ইসলাম ধর্ম ও রাসুল (সা.) সু-কবিতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। যেমন, তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে হযরত আনাস (রা.)-এর বর্ণনা সূত্রে পাওয়া যায়, রাসূল (সা.) উমরাতুল কাজার সময় মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। কবি আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাঁর সামনে সামনে চলছিলেন এবং কবিতা আবৃত্তি করছিলেন-
‘কাফির গোষ্ঠীকে তদের পথ থেকে ছেড়ে দাও,
আজ তাদের এমন মার দেব যে,
দলকে তাদের সর্দার এবং নেতাকে তার আরাম করার স্থান থেকে দূরে সরিয়ে দেব
এবং বন্ধুকে ভুলিয়ে দেব তার বন্ধুকে।’
তখন হযরত উমর (রা.) ইবনে রাওয়াহাকে বলেছিলেন- ‘হে ইবনে রাওয়াহা, রাসুলের সামনে এবং আল্লাহর হারাম শরিফের মধ্যে তুমি কবিতা আবৃত্তি করছ? তখন রসূল (সা.) হজরত উমর (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘উমর থামো, এটা নিশ্চয়ই তাদের (কাফেরদের) তীর নিক্ষেপের চেয়ে দ্রুত বিদ্ধ করবে।’

রাসুল (সা.) সাহাবি কবিদের মধ্যে থেকে কবি হাস্‌সান বিন সাবিতকে তাঁর সভাকবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। কবি হাস্‌সান বিন সাবিতকে বলা হয় ‘রাসূলের কবি’। কবিতা লেখার পুরস্কার হিসাবে কবি হাস্‌সান বিন সাবিত (রা.) জীবিত অবস্থায় বেহেশত পাওয়ার সংবাদ পেয়েছিলেন। কবি হাস্‌সান বিন সাবিতের কবিতা শুনে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘হে হাস্‌সান, আল্লাহর কাছ থেকে তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে জান্নাত।’

ইসলাম ধর্মে কবি ও কবিতাকে কতটা সমর্থন দেওয়া হয়েছে, সে প্রসঙ্গে ‘প্রিয়.কম’-এর ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান বলেন, ‘রাসূল (সা.)-এর আগমন ঘটেছিলো আরবি সাহিত্যের সোনালী যুগে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদদের মতে, সাহিত্য ছিল রাসূল (সা.)-এর অন্যতম একটি মোজেজা। তিনি ছিলেন সুসাহিত্যিক। মহানবী (সা.) ছিলেন আফসাহুল আরব বা আরবীদের মাঝে শ্রেষ্ঠতম সুভাষী। একথা তিনি নিজে বলেছেন। তিনি বলেছেন, আনা আফসাহুল আরব। কল্যাণকর সাহিত্যচর্চায় নবীজি (সা.) উৎসাহ প্রদান করেছেন এবং অকল্যাণকর বা মন্দ সাহিত্য চর্চাকে বাধা প্রদান করেছেন।

কবিতা সাহিত্যের অন্যতম একটি অঙ্গ। কল্যাণকর কবিতা চর্চাকে রাসূল (সা.) যেমন উৎসাহিত করেছেন, তেমনি অকল্যাণকর অহেতুক ও অশ্লীল কবিতাচর্চা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
পবিত্র কোরআনে কবিদের বিভিন্ন বর্ণনা সমৃদ্ধ ‘আশ-শুয়ারা’ নামের একটি সূরা নাজিল করেছেন আল্লাহ। তাতে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘এবং কবিদের যারা অনুসরণ করে তারা বিভ্রান্ত। আপনি কি দেখেন না যে, তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা অচিরেই জানবে কোন স্থানে তারা ফিরে আসবে। (সূরা-আশ-শুয়ারা, আয়াত ২২৪-২২৭)

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর কবি ও কবিতাপ্রেমী হজরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হাসসান বিন সাবিত, কাব ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবী কাঁদতে কাঁদতে রাসূলের (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা কেন এই আয়াত নাজিল করেছেন? আমরাওতো কবিতা রচনা করি, এখন আমাদের উপায় কী হবে? তাহলে কী আমরা কবিতাচর্চা বন্ধ করে দেব?’

রাসূল (সা.) বললেন, ‘আয়াতের শেষাংশ পাঠ করো। এই আয়াত নাজিলের উদ্দেশ্য হলো, তোমাদের কবিতা যেন অনর্থক ও ভ্রান্তির উদ্দেশ্যে রচিত না হয়। এই আয়াতের প্রথমাংশে মুশরিক, মুনাফিক কবিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এবং শেষাংশে তৎকালীন সমাজে ব্যতিক্রমী কবিদের কথা বলা হয়েছে। কাজেই তোমরা আয়াতের শেষাংশে উল্লিখিত কবিদের শামিল।’ (ফতহুল বারী)

এছাড়া হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা কাফির, মুশরিকদের নিন্দা করে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়। তীরের ফলার চেয়েও তা তাদের বেশি আহত করবে।’

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, নিঃসন্দেহে কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে প্রকৃত জ্ঞানের কথা। তিনি সাহাবিদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও। এতে তাদের কথা মিষ্টি ও সুরেলা হবে।
রাসূল (সা.)-এর উৎসাহে অনেক সাহাবি কাব্যচর্চার নিয়োজিত ছিলেন। নিয়মিত কাব্য চর্চাকারী সাহাবি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- হজরত হাসসান বিন সাবিত (রা.), হজরত কাব বিন মালিক (রা.), হজরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.), হজরত আলী ইবনে আবু তালিব, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হজরত উমর ফারুক (রা.), হজরত লবিদ বিন রাবিয়াহ (রা.), হজরত কাব ইবনে যুহাযের (রা.), হজরত আব্বাস বিন মিরদাস (রা.), হজরত যুহায়ের বিন জুনাব (রা.), হজরত সুহায়েম (রা.), হজরত আবু লায়লা (রা.)।

কল্যাণকর কাব্য রচনাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কাব্য রচনায় অশ্লীলতা বর্জনের ব্যাপারে রাসূল (সা.) কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইসলাম গ্রহণের পরও যে অশ্লীল কবিতা ছাড়তে পারল না, সে যেন তার জিভটাই নষ্ট করে ফেলল।’ রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ‘কারো পেট বা হৃদয় যদি পুঁজপূর্ণ হয়ে পচে যায়, তবু সেই পেট বা হৃদয় অশ্লীল কবিতার চেয়ে উত্তম।’

কবি ও কবিতা সম্পর্কে মূল্যায়ন ব্যক্ত করে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চইয় কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা। যে কবিতা সত্য আশ্রিত সে কবিতা সুন্দর। আর যে কবিতা সত্য বিবর্জিত সে কবিতার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।’

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন