পবিত্র কুরআন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য !!

মানুষ ও জিন জাতির হিদায়েতের জন্য সর্বশেষ নাজিলকৃত কিতাব হচ্ছে আল-কুরআন। এই কিতাব নাজিল হয়েছে হজরত মুহাম্মদ (সা.) -এর প্রতি। ইরশাদ হয়েছে, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস করে, আর এ (কুরআন)-ই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে (নাজিলকৃত) সত্য। তিনি তাদের মন্দ কাজগুলো বিদূরিত করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করবেন। (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ন করেছি, মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিলে দেওয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে। (সুরা নাহ্ল, ১৬ : ৪৪) এ আয়াতে ‘আয যিকর’ বলে কুরআন শরীফকেই বুঝানো হয়েছে। অন্য এক আয়াতে আরো ইরশাদ হয়েছে, আমি এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় যাতে তোমরা বুঝতে পার। (সূরা ইউসুফ, ১২ : ২)

কুরআন মাজিদ মানব জাতির জন্য একটি জীবন ব্যবস্থা যা খাতামুন নাবিয়্যিন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) -এর মাধ্যমে ইসলাম নামে পূর্ণতা লাভ করেছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই এই কিতাবের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই এতে কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের কোনো অবকাশ নেই। কুরআন শরিফ যেমনটি নাজিল হয়েছিল তেমনটিই রয়েছে এবং চিরকালই থাকেব। এর একটি শব্দ বা বর্ণ রদবদল হয়নি, কখনো হবেও না। অসংখ্য হাফিজের সিনায় পূর্ণ কুরআন শরিফ সংরক্ষিত আছে। এ-ও কুরআনই শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম মুজিযা। অন্য কোনো আসমানী কিতাব এভাবে সংরক্ষিত নেই। কুরআনই অপরিবর্তিত ধর্মগ্রন্থ রূপে চিরকাল বলবৎ থাকবে। এর মধ্যে বিবৃত আদর্শ, নীতি ও আইন-কানুন সব কালের সব দেশের সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

মহান রাব্বুল আলমীন লাওহে মাহফূজ থেকে অহির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) -এর প্রতি তার তেইশ বছরের নবুওয়াত কালে এ কিতাব নাজিল করেছেন। হজরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ (রহ.) -এর মতে কুরআনে যেসব ইলম বা জ্ঞান এবং উপদেশপূর্ণ তত্ত্ব ও তথ্য বর্ণিত হয়েছে তা পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়-

১. ইলমুল আহকাম বা বিধি-বিধান সম্পর্কিত ইলম : অর্থাৎ ইবাদত, মুআমালত বা লেনদেন, মুআশারাত বা আচার-ব্যবহার ইত্যাদির ক্ষেত্রে ওয়াজিবাত (অবশ্যকরণীয়), মদাহ (প্রশংসনীয়), মবাহ্ (বৈধ), মাকরূহ্ (অপসন্দনীয়) এবং হারাম (অবশ্য পরিত্যাজ্য) ইত্যাদি বিষয়াদি সম্পর্কিত আলোচনা বা ইলম।
২. ইলমুল মুখাসামা বা ন্যায়শাস্ত্র : অর্থাৎ ইয়াহুদি, খৃস্টান, মুশরিক ও মুনফিক এই চারটি পথভ্রষ্ট দলের সাথে বিতর্কে পারদর্শিতা লাভের জন্য প্রযোজনীয় ইলম।

৩. ইলমুত তাজকির বি আলাইল্লাহ : অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহ ও নিদর্শন সম্পর্কিত ইলম। এতে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির রহস্য, আল্লাহ প্রদত্ত ইলহাম এবং সৃষ্টিকর্তার গুণাবলীর পরিচয় সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো রয়েছে।
৪. ইলমুত তায্কীয় বি আইয়ামিল্লাহ : অর্থাৎ আল্লাহ্র সৃষ্টি বস্তুর অবস্থা, অনুগতদের পুরষ্কার ও অবাধ্যদের শাস্তি সম্পর্কিত বর্ণনা।
৫. ইলমুত তাযকীর বিল মাউরত ওয়া মা বাদার মাউত : অর্থাৎ মৃত্যু ও তার পরবর্তী কালে অবস্থা সম্পর্কিত ইলম। এতে পুনরুত্থান, একত্রীকরণ, হিসাব নিকাশ, মিজান ও জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ বিদ্যমান রয়েছে।
আল-কুরআনে এসব ইলম বিতরণেল জন্য সেকালের আরবদের নীতি অবলম্বন করা হয়েছে, পরবর্তীকালের আরবদের বর্ণনারীতির ভিত্তিতে নয়। বিধি-বিধান সম্পর্কিত আয়াত সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্ণনাকে দীর্ঘায়িতকরা হয়নি। কুরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানব সভ্যতার উৎকর্ষ বিধান, বাতিল ও ভ্রান্ত আকীদার মূলোৎপাটন এবং কুসংস্কার ও কু-কাজর্যসমূহ খতম করে আদর্শের ভিত্তিতে ব্যক্তি ও সমাজ গঠন করা।
কুরআন প্রদর্শিত জীবন পদ্ধতিই শ্রেষ্ঠ জীবন পদ্ধতি। কুরআনে নির্দেশিত সহজ পথ অনুসরণ করে নিজের ও অপরের ইহকাল ও পরকালের শাস্তি লাভ করতে পারে এবং পৌছাতে পারে অভিষ্ট লক্ষ্যে। এ জীবন যাপন করতে পারলেই মাটির মানুষ ফিরিশতার চেয়ে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে। একমাত্র আল-কুরআনই মানুষকে গৌরবের আসনে তুলে ধরতে এবং উন্নত জীবনবোধ উদ্বুদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং পারবে।
আল-কুরআনে মোট ১১৪ টি সূরা রয়েছে । এর মধ্যে ৮২ টি মাক্কি বা মক্কায় নাজিল হয়েছে আর ২০টি মাদানি বা মদিসাতে নাজিল হয়েছে। এছাড়া ১২ টিতে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে এ ১২ টি মাক্কি সূরা, আবার কারো মতে মাদানি। মাক্কি সূরাগুলোতে সাধারণত আকীদা তথা তাওহদি, রিসালত, আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম, হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে এবং মাদানী সূরাগুলোতে শরিয়তের হুকুম-আহকাম তথা আচার-ব্যবহার, হালাল-হারাম, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সমগ্র কুরআনে ১১৪ টি সূরায় প্রসিদ্ধ মতে আয়ত সংখ্যা মোট ৬৬৬৬টি।
কুরআন শরিফ ত্রিশ খণ্ডে বিভিক্ত। প্রতিটি খণ্ডকে ‘পারা’ বলা হয়। সাতদিনের খতম করার সুবিধার্থে উক্ত সূরাগুলোকে সাত মনজিলে বিভক্ত করা হয়েছে- ১. সূরা ফাতিহা থেকে সূরা নিসা পর্যন্ত, ২. সূরা মায়িদা থেকে সূরা তাওবা পর্যন্ত, ৩. সূরা ইউনুস থেকে সূরা নাহ্ল পর্যন্ত, ৪. সূরা ইসরাঈল থেকে সূরা তওবা পর্যন্ত, ৫. সুরা বনী ইসরাঈল থেকে সূরা ফুরকান পর্যন্ত, ৬. সূরা শুআরা থেকে সূরা ইয়াসীন পর্যন্ত, ৬. সূরা সাফফাত থেকে সূরা হুজুরাত পর্যন্ত, ৭. সূরা কাফ থেকে সূরা নাস পর্যন্ত।
আল-কুরআনে মোট ৫৫৪টি রুকু এবং ১৪টি সিজদার আয়াত রয়েছে। আল-কুরআনের শব্দ সংখ্যা ৮৬,৪৩০; হরফ সংখ্যা ৩,২২,৬৭১; যবর সংখ্যা ৫৩,২৪৩; যের সংখ্যা ৩৯,৫৮২; পেশ সংখ্যা ৮,৮০৪। তাশদীদ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে ১২৫৩ বার এবং মদ ব্যবহৃত হয়েছে ১৭৭১ বার। আল-কুরআনে নুকতা রয়েছে ১, ০৫,৬৮২ টি।

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন