হাদীসের মর্যাদা ও হাদীস অমান্য করার পরিণতি

হাদীস অস্বীকার প্রসঙ্গে দুটি কথা:

সুপ্রিয় বন্ধুগণ, বর্তমান যুগে অগণিত ফিতনার মাঝে একটি বড় ফিতনা হল হাদীস অস্বীকার করা ফিতনা। এই হাদীস অস্বীকার কারীর দল তাদের নোংরা নখর বের করে সরাসরি রাসূল (ﷺ) এর স্বত্বা এবং হাদীসে রাসূলের উপর কঠিন ভাবে আক্রমণ শুরু করেছে। কারণ, হাদীস থেকে মুসলিমদের দূরে সরাতে পারলে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো পানির মত সোজা। এ জন্য তারা ফেসবুক, ওয়েবসাইট ও ওয়া মাহফিল, সভা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের এই জঘন্য অপ ত পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে তারা হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলছে। হাদীসের অপব্যাখ্যা

করে তার মানহানি হাদীসের মর্যাদা ও হাদীসকরছে। হাদীসকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। তারা বলতে চায় শুধু কুরআন যথেষ্ট। হাদীস মানার প্রয়োজন নাই। হাদীস বা সুন্নাহ শব্দটি তারা শুনতে চায় না। যার কারণে এরা নিজেদেরকে নাম দিয়েছে আহলে কুরআন বা কুরআনের অনুসারী।

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ভবিষ্য বাণী কত সত্য ভাবে প্রকাশিত হয়েছে!! তিনি বলেছেন:

(ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه لا يوشك رجل شبعان على أريكته يقول عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فأحلوه وما وجدتم فيه من حرام فحرموه)

“জেনে রাখ, আমি কুরআন প্রাপ্ত হয়েছি এবং তার সাথে আরও অনুরূপ আরেকটি জিনিস (তা হল হাদীস)। অচিরেই দেখা যাবে, এক লোক ভরা পেটে তার খাটের উপর থেকে বলবে: তোমরা এই কুরআনকে আঁকড়ে ধর। এতে যে সকল বস্তু হালাল পাবে সেগুলোকে হালাল মনে কর, আর যে সব বস্তুকে হারাম পাবে সেগুলোকে হারাম মনে কর।“ (আবু দাউদ, মিকদাদ ইবনে মাদিকারাব থেকে বর্ণিত, সনদ সহীহ)

উক্ত হাদীসটি আল্লাহর নবী (ﷺ) নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ বহন করে। কারণ, নবুওয়তের যুগ পার হওয়ার পরপরই শিয়া ও খারেজী সম্প্রদায়ের হাত ধরে বিভিন্ন দল তৈরি হয় তারা হাদীসের উপর আক্রমণ শুরু করে। তারা বলে কুরআনই যথেষ্ট এবং হাদীস ও সু্ন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে নতুন করে এই ভ্রান্ত মতবাদের উ পত্তি হয়। তারপর তা পাকিস্তানে জায়গা নেয়। এরপরে ক্রমান্বয়ে তা আরও বিভিন্ন মুসলিম দেশে সংক্রমিত হতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ তাদের জমজমাট কার্যক্রম রয়েছে। এমতের অনুসারীদের কেউ কেউ ইউরোপ-আমেরিকায় বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের এই বিষাক্ত মতবাদ প্রচার করে যাচ্ছে। ফেসবুকে গড়ে তুলেছে বড় একটা গ্রুপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামে হাদীসের মর্যাদা ও হাদীসের অস্বীকার কারীদের পরিণতি সম্পর্কে নিন্মোক্ত প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে যেন, বাংলাভাষী মুসলিমগণ হাদীসের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে তার হেফাজতের জন্য সর্ব শক্তি নিয়োগ করে এবং বাতিলের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকে। আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদেরকে তাওফীক দান করুন।

প্রবন্ধটি লিখেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট, দাঈ, ও গবেষক শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী। আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন। আমীন। -সম্পাদক

লেখকের ভূমিকা: আল হামদুলিল্লাহ্ ওয়াস্ স্বলাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ্ ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া মান ওয়ালাহ।

মহানবী মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ্ (ﷺ) চল্লিশ বছর বয়সের পূর্বে জাতির সাধারণ মানুষদের মতই জীবন-যাপন করতেন। আল্লাহ তাকে নির্বাচিত করে পথভ্রষ্ট সমগ্র মানব জাতিকে (৩৪:২৮) সঠিক পথে আহ্বানের জন্যে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করলেন। শিক্ষা দিলেন কুরআন ও ঈমান। তারপর দায়িত্ব দিলেন সেই পথে মানুষকে আহ্বানের। আল্লাহ বলেন:

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ

“আর এইভাবে আমি আপনার প্রতি ওয়াহ্‌য়ী করেছি রূহ (কুরআন) আমার নির্দেশে; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি ও ঈমান কি, পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করে দেই। আর আপনি অবশ্যই সরল সঠিক পথে মানুষকে আহ্বান করতেই থাকবেন।”(সূরা শূরা: ৫২) আল্লাহরাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আদেশ করলেন মানুষকে হেদায়াত করার, আর মানুষকে আদেশ করলেন তিনি যা বলেন তা গ্রহণ করার।

রাসূল (ﷺ) যা দিয়েছেন তাই হচ্ছে হাদীছ। আল্লাহ বলেন:

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

“রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর, আর তিনি যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক। (সূরা হাশর: ৭)

এই রাসূল আমাদেরকে যেমন কুরআন দিয়েছেন, সেই সাথে কুরআনকে কিভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হও, তাও আল্লাহর নির্দেশ মোতাকেব দিয়েছেন। আর বাস্তব জীবনের ঐ প্রয়োগটাই হচ্ছে বিদগ্ধ বিদ্বানদের ভাষায় হাদীছ। কুরআনে যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূলও কিছু বিষয় নিষেধ করেছেন। যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। রাসূলের আদেশ-নিষেধের কোন দরকার না থাকলে, আল্লাহ তাঁর কথা উল্লেখ করতেন না। বলতেন এই কুরআনে যা আছে তোমরা তা মেনে নাও, যা নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে দূরে থাক। অথচ কুরআনকে মেনে নেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ বহু জায়গায় নির্দেশ দিয়েছেন। এ স্থানে বিশেষ ভাবে রাসূলের প্রদান এবং নিষেধের কথা উল্লেখ করায় বুঝা যায় তিনিও আদেশ করেন এবং নিষেধ করেন। তবে অবশ্যই তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়ে থাকে। আর তাঁর এই আদেশ-নিষেধই হচ্ছে হাদীছ।

২) আল্লাহ যেমন ফায়সালা করেন রাসূল (ﷺ)ও তেমন করেন:

কুরআনের অনেক স্থানে রাসূলও নির্দেশ দেন ফায়সালা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন:

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا

“আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কোন বিষয় ফায়সালা করলে কোন ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করার কোন অধিকার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করবে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে।” (সূরা আহযাবঃ ৩৬)

এখানে, আল্লাহর ফায়সালা যেমন লঙ্ঘন করার কারো অধিকার নেই, তেমনি রাসূলের আদেশ লঙ্ঘনেরও কোন অধিকার কারো নেই। আল্লাহর আদেশ অমান্য করলে যেমন পথভ্রষ্ট হতে হবে তেমনি রাসূলের আদেশ লঙ্ঘন করলেও একই পরিণতি হবে। রাসূলের কোন আদেশ নিষেধ না থাকলে তাঁর কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা অনর্থক হয়ে যায়।

৩) রাসূল (ﷺ) এর ফায়সালা না মানলে ঈমান থাকবে না:

রাসূলের ফায়সালা ও আদেশ-নিষেধের গুরুত্ব কত বেশী যে তা না মানলে মানুষ মুমিনই থাকবে না। আল্লাহ বলেন,

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“আপনার পালনকর্তার শপথ তারা ইমানদার হতে পারবে যে পর্যন্ত তারা পরস্পর বিরোধের বিষয়ের সমাধানের জন্যে আপনাকে বিচারক বা ফায়সালা কারী হিসেবে মেনে না নিবে, তারপর আপনি যে ফায়সালা করবেন তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না এবং তার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করবে।” (সূরা নি(ﷺ) ৬৫)

এখানে ভাষার প্রয়োগ রূপটা দেখুন কিভাবে তাঁকে সম্বোধন করে ‘উপস্থিত একবচন’ শব্দ يُحَكِّمُوكَ “আপনাকে বিচারক মানবে” এবং قَضَيْتَ “আপনি ফায়সালা করেন।” আর রাসূল (ﷺ) যা বিচার বা ফায়সালা করেছেন তাই হচ্ছে হাদীছ। রাসূল (ﷺ)এর যদি কোন ফায়সালা না থাকে বা তাঁর কথার কোন দরকার না থাকে, তবে তাঁকে বিশেষভাবে সম্বোধন করে এভাবে কথা বলা অনর্থক হয়ে যায়।

৪) আল্লাহর ন্যায় রাসূল (ﷺ) ও হালাল ও হারাম করেন:

আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) হালাল করেন এবং হারামও করেন- আল্লাহ তাঁকে এই অনুমতি দিয়েছেন । আল্লাহ বলেন:

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

“যারা নিরক্ষর নবী রাসূল (মুহাম্মাদ) এর অনুসরণ করে, যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায় (সেই নিরক্ষর নবী (ﷺ) মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন ও অন্যায় করতে নিষেধ করেন। তিনি তাদের জন্যে পবিত্র বস্তু সমূহ হালাল করে দেন এবং অপবিত্র বস্তু সমূহকে তাদের জন্যে হারাম করে দেন। আর তাদের উপর চাপানো বোঝা ও বন্ধন হতে তাদের মুক্ত করেন। অতএব যেসব লোক তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য লাভ করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সেই নূরের (কুরআনের) অনুসরণ করেছে যা তাঁর নিকট নাযিল হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই সফলতা লাভ করেছে। (সূরা আরাফ: ১৫৭)

এই আয়াতও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)ও আল্লাহর নির্দেশক্রমে কিছু বিষয় হালাল করেছেন এবং কিছু হারাম করেছেন। অচিরেই আমরা তার উদাহরণ উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ। এই আয়াতেও লক্ষ্য করুন প্রথম দিকে নবীজীর অনুসরণের কথা বলার পর আবার তাঁর নিকট নাযিল কৃত নূর তথা কুরআনের অনুসরণের কথা আলাদাভাবে বলা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় কুরআনের অনুসরণ যেমন দরকার, তেমনি কুরআন প্রচারকারী মুহাম্মাদ (ﷺ)এর অনুসরণও দরকার। আর সেই অনুসরণই হচ্ছে তাঁর সীরাতের অনুসরণ তাঁর জীবনীর অনুসরণ অন্য কথায় তাঁর হাদীছের অনুসরণ।

৫) হাদীছ না মানলে কুরআন মানা হবে না:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর অনুসরণই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে কুরআনের অনুসরণ, কেননা তিনি কুরআনকে কিভাবে অনুসরণ করতে হবে তা নিজের জীবনে যেমন বাস্তবায়ন করেছেন, অনুরূপ তার যথাযথ তা’লীম সাহাবায়ে কেরামকেও দিয়ে গেছেন। এজন্যে আল্লাহ বলেছেন:

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ

“যে রাসূলের অনুসরণ করবে সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহরই অনুসরণ করবে।” (সূরা নিﷺ ৮০) আর তাঁর সুন্নাত বা জীবনীর অনুসরণ না করলে কুরআনের অনুসরণ সম্ভব নয়। যদি কুরআনের অনুসরণই যথেষ্ট হত, তবে আলাদাভাবে নবী (ﷺ)এর অনুসরণের প্রতি তাগিদ দেয়া হত না। বরং আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাইলে, তাঁর মাগফিরাত কামনা করলে রাসূল (ﷺ)এর অনুসরণ ছাড়া গত্যন্তর নেই।

আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيم

“বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের সমুদয় পাপ মার্জনা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)

আলাদাভাবে রাসূলের অনুসরণের দরকার না থাকলে এখানে ي (আমার) সর্বনাম দ্বারা বাক্যটিকে উল্লেখ করার দরকার ছিল না। অতএব কুরআন অনুসরণ করতে চাইলে রাসূল (ﷺ)এর অনুসরণ দরকার। অন্যকথায় রাসূলের তথা তাঁর হাদীছের অনুসরণ না করলে আল্লাহর কুরআনের অনুসরণ হবে না, তাঁর ভালবাসা পাওয়া যাবে না এবং তাঁর মাগফিরাতও লাভ করা যাবে না।

৬) প্রশ্ন: কুরআন থাকতে রাসূল (ﷺ) কেন আদেশ-নিষেধ করবেন? আর তার অনুসরণই বা আমরা করব কেন? তাহলে কি কুরআন পরিপূর্ণ গ্রন্থ নয়?

কেন তাঁর অনুসরণ করতে হবে? তার জবাব তো পূর্বের আয়াতগুলো থেকেই বিস্তারিত ভাবে পাওয়া যাচ্ছে। বাকী থাকল কুরআন থাকতে কেন তিনি আদেশ-নিষেধ করবেন? এর জবাব হচ্ছে ইসলামকে পরিপূর্ণ করার দায়িত্ব আল্লাহর এবং তিনি তা করেছেনও। তিনি ইসলামের সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। আর তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)কে। তিনি বলেন:

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ

“হে রাসূল! আপনার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে তা পৌঁছিয়ে দিন।” (মায়েদাঃ ৬৭) সাথে সাথে এই পৌঁছে দেয়ার সময় যেন বিশদভাবে তা ব্যাখ্যা করে দেন। তাই আল্লাহ বলেন:

وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ

“নিশ্চয় আমি আপনার নিকট জিকির (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে আপনি বিশদভাবে মানুষের নিকট বর্ণনা করে দেন যা তাদের নিকট নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা নাহাল: ৪৪)

তাঁর এই বর্ণনা দুটি পদ্ধতিতে হয়েছে। একটি মানুষকে সরাসরি কুরআন তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। যে কুরআন আল্লাহ জিবরীল (আঃ) কর্তৃক সরাসরি নাযিল করেছেন। এটাকে বলা হয় ওয়াহ্‌য়ী মাতুল। অর্থাৎ এর ভাব ও ভাষা উভয়টি আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি এসেছে। আরেকটি পদ্ধতি কুরআনের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। অর্থাৎ শব্দ বা বাক্যের ব্যাখ্যা উম্মতকে জানিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। যা তিনি পরোক্ষ অহির মাধ্যমে আল্লাহর নিকট থেকে লাভ করেছেন। অর্থাৎ কুরআনের সংক্ষেপ ও সাধারণ আয়াত সমূহকে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণ আয়াতকে সীমাবদ্ধ করেছেন। আবার শর্তযুক্ত আয়াতকে সাধারণ করেছেন। ব্যাপক অর্থবোধক আয়াতকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছেন ইত্যাদি। আর তা হয়েছে তাঁর কথা, কাজ ও সমর্থনের মাধ্যমে। যার অপর নাম হচ্ছে হাদীছ।

তিনি এসব করার অধিকার কিভাবে পেলেন? এই অধিকার আল্লাহই তাকে দিয়েছেন যেমনটি সূরা নাহালের ৪৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে তিনি নিজের পক্ষ থেকেও এটা করেননি; পরোক্ষভাবে আল্লাহর নিকট ওয়াহ্‌য়ী বা নির্দেশনা লাভ করেই তিনি করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন:

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى

“তিনি নিজের পক্ষ থেকে প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে কোন কথা বলেন না, তিনি যা বলেন তা ওয়াহ্‌য়ী, যা তাঁর নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।” (সূরা নাজমঃ ৩-৪)

এখানে ওয়াহ্‌য়ী বলতে যেমন কুরআন উদ্দেশ্য, তেমনি কুরআন বুঝানোর জন্যে নবী (ﷺ)এর ব্যাখ্যাও উদ্দেশ্য। যার প্রমাণ আমরা অচিরেই পেশ করছি।

৭) ওয়াহ্‌য়ীর নিয়ম:

আল্লাহ তিনটি নিয়মে মানুষের কাছে তথা নবী-রাসূলদের কাছে ওয়াহ্‌য়ী প্রেরণ করেছেন। তিনি বলেন:

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ

“কোন মানুষের জন্যে সমীচীন নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন; কিন্তু (১) ওয়াহ্‌য়ীর মাধ্যমে অথবা (২) পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা (৩) তিনি কোন দূত প্রেরণ করবেন, অতঃপর আল্লাহ যা চান, সে তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেবে। (সূরা শূরা: ৫১) অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই ওয়াহ্‌য়ী করেন।

মোটকথা, আল্লাহ তায়ালা তিনভাবে নবী-রাসূলদের প্রতি ওয়াহ্‌য়ী করেন:

১) এলহাম:

নবী (ﷺ) এর র অন্তরে যে বিষয়কে জাগ্রত করতেন সেটাই হল এলহাম। সেটাই হল পরোক্ষ ওয়াহ্‌য়ী বা ওয়াহ্‌য়ী গাইর মাতুল। এটা কোন ফেরেশতার মাধ্যমে ছিল না। বিষয়টি যেমন জাগ্রত অবস্থায় হত তেমনি স্বপ্ন যোগেও হত। এমতাবস্থায় সাধারণত: আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শব্দ বা বাক্য অবতীর্ণ হয় না; কেবল বিষয়বস্তু অন্তরে জাগ্রত হয়, যা পয়গম্বরগণ নিজের ভাষায় ব্যক্ত করেন। আর সেটাই হচ্ছে মুহাদ্দেছীনদের পরিভাষায় হাদীছ বা সুন্নাহ্।

২) পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথা বলা:

আল্লাহ তায়ালা মুসা (আঃ)এর সাথে তূর পর্বতে পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথা বলেছিলেন। আর আমাদের নবী (ﷺ)এর সাথে মেরাজে গিয়ে আরশে পাকে হয়েছিল। আল্লাহ দর্শন না দিয়ে পর্দার অন্তরাল থেকে তাঁদের সাথে কথা বলেছেন এবং ওয়াহ্‌য়ী করেছেন আর সে সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন।

৩) জিবরাঈল (আঃ) এর মারফতে:

তৃতীয় পদ্ধতিটিই সবচেয়ে বেশী ব্যবহার হয়েছে আল্লাহর ওয়াহ্‌য়ী বা নির্দেশনা নাযিলের ক্ষেত্রে। আর তা হয়েছে জিবরাঈল (আঃ)এর মারফত। তাঁকে আমীনুল ওয়াহ্‌য়ী বলা হয়। কুরআনে রূহুল আমীন বলা হয়েছে। রাসূল কারীম (সম্মানিত দূত) বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ

“বিশ্বস্ত রূহ (জিবরীল ফেরেশতা) উহা (কুরআন) নিয়ে অবতরণ করেছেন।”(সূরা শুআরাঃ ১৯৩)

আল্লাহ আরও বলেন:

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ (19) ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ (20) مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ

“নিশ্চয় উহা (কুরআন) সম্মানিত রাসূল (দূত জিবরীল (আঃ)এর আনিত বাণী। যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাশালী, ফেরেশতাগণের মান্যবর এবং আল্লাহর বিশ্বাসভাজন।” (সূরা তাকভীরঃ ১৯-২১)

আল্লাহ আরও বলেন,

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ

“নিশ্চয় এই কুরআন একজন সম্মানিত রাসূলের আনিত বাণী।” (সূরা হাক্কাহঃ ৪০)

হাদীছ অস্বীকারকারীরা এই আয়াতগুলোতে ‘রাসূল’ বলতে মুহাম্মাদ (ﷺ)কে বুঝাতে চায়। অথচ আয়াতের প্রসঙ্গতেই বুঝা যায় এখানে জিবরীল (আঃ)কে বুঝানো হয়েছে।

৮) আল্লাহ হাদীছ নাযিল করেছেন:

এখানে উল্লেখিত প্রথম পদ্ধতিটি হচ্ছে এমন ওয়াহ্‌য়ী যা আল্লাহ কোন ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া নাযিল করেছেন। আর সেটার সমর্থনে কুরআনে আরও অনেক আয়াত পাওয়া যায়। ইবরাহীম (আ) কাবা গৃহ নির্মাণ করার পর ইসমাঈল (আ)এর বংশের জন্যে দুআ করেছিলেন। সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

“হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের মধ্যে থেকে তাদের মধ্যে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের নিকট আপনার আয়াত সমূহ তেলাওয়াত করে শোনাবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা প্রদান করবে এবং তাদেরকে শিরক ও পাপাচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি মহা পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ।” (সূরা বাকারাঃ ১২৯)

আল্লাহ এই দুআ কবুল করে তাদের মধ্যে তথা ইসমাঈলের বংশধর আরব জাতির মধ্যে সেই রাসূল প্রেরণ করেছেন। সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদেরই ভিতর থেকে তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। যে তাদেরকে তাঁর আয়াত সমূহ তেলাওয়াত করে শোনাবে, তাদেরকে পবিত্র করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে। যদিও তারা ইতোপূর্বে সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল।” (সূরা আল ইমরান: ১৬৪)

এ দু’টি আয়াতে হিকমত হচ্ছে রাসূল (ﷺ)এর হাদীছ, তিনি যা মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন।

আল্লাহ যেমন কুরআন নাযিল করেছেন তেমনি হিকমত তথা হাদীছও নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন,

وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ

“তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, আর যে কিতাব ও হিকমত তোমাদের নিকট নাযিল করেছেন, যা দ্বারা তিনি তোমাদের উপদেশ প্রদান করেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৩১)

এখানে হিকমত অর্থ সুন্নাত বা রাসূল (ﷺ) এর হাদীছ যা আল্লাহ পরোক্ষভাবে কোন ফেরেশতার মাধ্যম ব্যতীত তাঁর নবীর কাছে নাযিল করেছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)বলেন, “আল্লাহ এই আয়াতে الْكِتَابِ উল্লেখ করেছেন তার অর্থ হচ্ছে কুরআন। আর উল্লেখ করেছেন وَالْحِكْمَةِ। আমি কুরআনের পণ্ডিতদের নিকট শুনেছি তাঁরা বলেছেন এখানে হিকমত হচ্ছে রাসূল (ﷺ)এর সুন্নাত। তিনি বলেন, এখানে হিকমত অর্থ রাসূল (ﷺ)এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কিছু করা জায়েজ হবে না। কেননা উহা কিতাবের কথা উল্লেখ করার সাথে সাথেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ তাঁর নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করা মানুষের উপর ফরয করে দিয়েছেন

৯) হাদীছ ব্যতীত কুরআনের প্রতি আ‘মাল করা অসম্ভব:

কুরআন আল্লাহর বাণী। আল্লাহ ইহা নাযিল করেছেন মুহাম্মাদ (ﷺ)এর উপর। তিনি নিজে কুরআনের প্রতি আ‘মাল করেছেন এবং কিভাবে আ‘মাল করতে হবে তা তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে শিখিয়েছেন। সুতরাং কুরআনের প্রতি আ‘মাল করতে চাইলে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)এর নিকট থেকেই জানতে হবে তিনি কিভাবে এই কুরআনের প্রতি আ‘মাল করেছেন। তাঁর অনুসরণ না করলে কখনই কুরআন পুরাপুরি রূপে বুঝা যাবে না এবং আমলও করা যাবে না। কেননা কুরআনের প্রতিটি কথার বিবরণ ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল (ﷺ)কে দিয়েছেন। তিনি বলেন,

وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ

“নিশ্চয় আমি আপনার নিকট জিকির (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে আপনি বিশদভাবে মানুষের নিকট বর্ণনা করে দেন যা তাদের নিকট নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা নাহাল: ৪৪)

আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, “তাঁর চরিত্র ও জীবনী ছিল কুরআন।” অর্থাৎ কুরআন পাঠ করার সাথে তাঁর জীবনী পাঠ করলে এবং তাঁর হাদীছ পাঠ করলে কিভাবে তিনি কুরআনের প্রতি আ‘মাল করেছেন তা বাস্তব ভাবে বুঝা যাবে।

আইয়ুব সুখতিয়ানী থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি মুতাররেফ বিন আবদুল্লাহ বিন শিখ্খীরকে বলল, কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু আমাদের নিকট বর্ণনা করবেন না। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমরা কুরআনের বিপরীতে কিছু চাই না। কিন্তু আমরা তাঁকে চাই যিনি কুরআন সম্পর্কে আমাদের চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখতেন।” (ইবনে আবদুল বার্ জামে বায়ানুল ইলম ২/১১৯৩)

অতএব রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এর সম্পূর্ণ জীবনীর অনুসরণ না করে বাহ্যিকভাবে কুরআন মানার দাবী করা হলেও, মূলত: তা অমান্য করারই শামিল। কেননা তাঁর জীবনী আমাদের আদর্শ। (আহযাব: ৩২) তাঁকে অনুসরণ করলেই আমরা সঠিক হেদায়াত লাভ করব। (বাকারা: ১৩৫) তাঁকে অনুসরণ করলে আল্লাহকেই অনুসরণ করা হয়। (নিﷺ: ৮০) তাঁকে অনুসরণ করলে আল্লাহ আমাদের ভালবাসবেন এবং আমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (আল ইমরান: ৩১)

১০) হাদীছ না মানলে কুরআনকে যথাযথভাবে মানা হয় না:

(১) স্বলাত: মুসলিমের উপর সবচেয়ে বড় ফরয ইবাদত। এই ইবাদত কার উপর, কোন কোন সময়, দিনে-রাতে কতবার, কত রাকাত, কি পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে, রুকু-সিজদার নিয়ম ইত্যাদি কোন কিছুই কুরআনে উল্লেখ হয় নি। স্বলাতের জন্যে কি পদ্ধতিতে কি শব্দ উচ্চারণ করে আহ্বান করতে হবে? মানুষ মৃত্যু বরণ করলে তার জানাযা স্বলাত কি পড়তে হবে? দু’ঈদের স্বলাত বলতে কি কিছু আছে? এগুলো নবী (ﷺ)এর হাদীছ থেকেই জানতে হবে।

(২) যাকাত: ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। কোন ধরণের সম্পদ,কি পরিমাণ, কত দিন কাছে থাকলে, কি পরিমাণ যাকাত বের করতে হবে। উট, গরু, ছাগল, শস্য, স্বর্ণ-রৌপ্য ইত্যাদি সম্পদের যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ কি? রমাযান শেষে যাকাতুল ফিতর দিতে হবে কি না? ইত্যাদি হাদীছ থেকে জানতে হবে।

(৩) পবিত্রতা: পবিত্রতার ক্ষেত্রে কুরআনে কিছুটা বিস্তারিত থাকলেও নারীদের ঋতু অবস্থায় তার সাথে কি আচরণ করতে হবে তার বিবরণ হাদীছ থেকে নিতে হবে। কুরআনের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী ঐ অবস্থায় ঋতুবতীর সাথে উঠা-বসা, পানাহার, কথা বলা, শুয়ে থাকা, স্পর্শ করা কোন কিছুই করা যাবে না (২:২২২)। কিন্তু হাদীছ বলেছে, ঐ অবস্থায় শুধুমাত্র সহবাস ব্যতীত সবকিছু করা যাবে।

(৪) হজ্জ: ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। জীবনে কয়বার হজ্জ ফরয? ইহরাম কিভাবে করতে হবে, কাবা ঘরের তওয়াফ কিভাবে, কয়বার করতে হবে? কিভাবে কতবার সাফা-মারওয়া সাঈ করতে হবে, মিনা, আরাফাত, মুযদালিফা, কুরবানী করতে হবে? ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ হাদীছ থেকেই নিতে হবে।

(৫) সিয়াম: এ সম্পর্কে কিছু মাসআলা কুরআনে থাকলেও বিস্তারিত বিবরণ হাদীছ থেকেই নিতে হবে।

(৬) চুরির শাস্তি: চোরের হাত করতে হবে কুরআনে আছে। কিন্তু কি পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে আর কি পরিমাণে হাত কাটা যাবে না তার বিবরণ হাদীছ থেকে নিতে হবে। কেননা ১টাকা চুরি করা আর ১ লক্ষ টাকা চুরি করার অপরাধ কিন্তু একই। উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তি চোর সাব্যস্ত হবে। কিন্তু শাস্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই এক সমান হবে না। তাছাড়া হাত কাটলে কি পরিমাণ কাটতে হবে? কব্জি থেকে না কনুই থেকে না সম্পূর্ণ হাত কাটতে হবে?

(৭) মীরাছ: মা অনুপস্থিত থাকলে দাদী মীরাছ পাবে কি না?

(৮) বিবাহ: স্ত্রীর ফুফু অথবা খালাকে বিবাহ করা কি বৈধ? দুগ্ধ সম্পর্কিত কোন্ কোন্ নারীকে বিবাহ করা হারাম ইত্যাদি বিবরণ কুরআনে নেই। আছে হাদীছে।

(৯) মদপান: কুরআনে মদ্যপান হারাম করা হয়েছে। এখন হেরোইন, আফিম, গাঁজা ইত্যাদি মাদকদ্রব্য কুরআনের কোন আয়াতের মাধ্যমে হারাম করবেন? হাদীছের মূলনীতির মাধ্যমে তা হারাম হবে। “যা বেশী খেলে বা সেবন করলে মাদকতা আসে, তার অল্পটাও হারাম।” (আবু দাউদ)

(১০) মৃত প্রাণী খওয়া: কুরআন বলছে মৃত প্রাণী খওয়া হারাম। কিন্তু হাদীছ বলছে পানির মাছ মৃত হলেও তা খাওয়া হালাল। কুরআনে পশুকুলের মধ্যে শুধু শুকরকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুকুর-শিয়াল, বিড়াল, বাঁদর, বাঘ-ভল্লুক, সাপ-বিচ্ছু, পোকা-মাকড়, কিট-পতঙ্গ, ঈগল, চিল, বাজ, শুকন… ইত্যাদি হারাম হওয়ার ব্যাপারে হাদীছে মূলনীতি বেঁধে দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, “দাঁত দ্বারা শিকার করে এরকম সকল হিংস্র পশু হারাম। আর থাবা দিয়ে শিকার করে এমন প্রত্যেক পাখি হারাম।” (বুখারী ও মুসলিম)

(১১) স্বলাত কসর করা: কুরআনে সূরা নিসায় (আয়াত ১০১) সফর অবস্থায় শত্রুর ভয় থাকলে স্বলাতকে কসর করতে বলা হয়েছে; অথচ রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) ভয় থাকুক আর না থাকুক উভয় অবস্থায় স্বলাত কসর করে বলেছেন, “স্বলাত কসর করা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সদকা, অতএব তোমরা আল্লাহর সদকা গ্রহণ কর।” (মুসলিম)

(১২) পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশম ব্যাবহার করা: কুরআন বলে, “কে আল্লাহর সৌন্দর্যকে হারাম করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্যে পাঠিয়েছেন? (আরাফ: ৩২) অথচ হাদীছে রাসূলু্ল্লাহ্ (ﷺ) পুরুষদের জন্যে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারকে হারাম করেছেন। (হাকেম) হাদীসের মর্যাদা ও হাদীস

এধরণেরে আরও অসংখ্য অগণিত বিষয় আছে যা কুরআনকে সামনে রেখে তার ব্যাখ্যা হাদীছ থেকেই জেনে নিতে হবে।

জনৈক মহিলা ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে বলল, আপনারা নাকি বলেন, “যে নারীরা (হাতে বা মুখমণ্ডলে) খোদাই করে নকশা করে এবং যারা নকশা করিয়ে নেয়, যে নারীরা ভ্রুর চুল উঠিয়ে নেয় এবং যে নারীরা দাঁত সুন্দর করার জন্যে তাতে ফাঁক সৃষ্টি করে এদের সবাইকে আল্লাহ লানত করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সত্য কথা। মহিলাটি বলল, আমি আল্লাহর কিতাব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোথাও তো একথা পাই নি? ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, তুমি যদি কুরআন পড়তে তবে তা পেতে। তুমি কি পড়নি আল্লাহর বাণী:

ومَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا

“রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (হাশরঃ ৭) সে বলল, একথা তো কুরআনে আছে। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)কে উক্ত কথা বলতে শুনেছি। (বুখারী ও মুসলিম)

অতএব যারা কুরআন মানার দাবী করবে,তাদের হাদীছ না মেনে উপায় নেই। হাদীছ মানলেই কুরআন মানা হবে এবং সত্যিকার অর্থে তারা কুরআনের অনুসারী হবে এবং প্রকৃত মুসলিম হবে

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন