সৌদি-মিসর সম্পর্ক নষ্টে নেপথ্য শক্তিধর কারা?

অনেক গোষ্ঠী আছে, যারা সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়। এদের সর্বশীর্ষে রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড ও মিসরের বামপন্থী দলগুলো। এতে নাসিরী সম্প্রদায় ও তথাকথিত সুশীল সমাজও শামিল রয়েছে। সৌদি-মিসর সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টির নেপথ্যে কী? এর মূল কারণ হলো সৌদি আরবের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘদিন ধরেই বেশ দূরত্ব রয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুড হচ্ছে সৌদি রাজপরিবারের জন্য এক আতঙ্কের নাম। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এই আতঙ্ক বর্তমানে আরও বেশি। কারণ ২০১১ সালের আরব বসন্তের ফলে মিসর ও তিউনিসিয়ায় ক্ষমতায় আসে মুসলিম ব্রাদারহুড। এতে রাজ পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, হয়তো সৌদি হবে তাদের পরবর্তী প্রধান টার্গেট। সৌদি আরব অঢেল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও শাসকগোষ্ঠীর মানসিক দুর্বলতা প্রকোট। সাধারণ মানুষের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার মানসিক শক্তি তাদের নেই। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপুক্ত সৌদি-মিসর সম্পর্ক নষ্টে নেপথ্য শক্তিধর কারা?করার জন্য ব্রাদারহুডকে তারা কোণঠাসা করে রাখতে চায়। আর তাই সৌদি রাজতন্ত্র ব্রাদারহুডকে শুধু শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী সংগঠন বলেই ক্ষ্যান্ত হয়নি; বরং এটাকে তালিকার শীর্ষে রেখেছে। এমনকি সৌদি সরকারের কাছে ব্রাদারহুড আল কায়েদার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। তাই মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সৌদি রাজতন্ত্র মিশরকেই রণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিশরেই এবং এর সর্বোচ্চ পথপ্রদর্শক সবাই মিশরীয়। আঞ্চলিক প্রতিনিধিরাও মিশর কেন্দ্রিক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।
সৌদি আরবের প্রধান টার্গেট হচ্ছে ব্রাদারহুডের শাখাগুলোকে ধ্বংস করে এর মূল নেতৃত্বকে দুবর্ল করে ফেলা। যাতে তারা তাদের ক্ষমতার মসনদের কাঁটা না হয়। তাছাড়া যত দেশে ব্রাদারহুডের শাখা রয়েছে তত দেশে হামলা করতে গেলে সৌদির বন্ধু-রাষ্ট্রগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জর্দান, কুয়েত এবং অন্যান্য জোটভুক্ত দেশগুলোতেও ব্রাদারহুডের কর্মকান্ড বিস্তৃত। তার চেয়ে মিশরেই ব্রাদারহুডকে শেষ করে দিতে পারলে তার যুদ্ধবিস্তৃত হওয়া ও ব্যাপক ক্ষতি হওয়া ছাড়াই শত্রু মরে যাবে এবং দূর থেকেই যুদ্ধ শেষ হবে এবং স্বঘোষিত ইসলামের হেফাজতকারী সৌদি রাজতন্ত্রের হাতে রক্তের দাগও লাগবে না। কার্যত মিশরীয় জেনারেলদের ভাড়া করে তারা নিজেরা লড়াইয়ের ময়দানে উপস্থিত না থেকেও এক নব কৌশলে শত্রুর বিরূদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার করেছে সৌদি আরব।

শুধু ব্রাদারহুডকর্মীরাই যে সৌদি রাজতন্ত্রকে আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে তাই নয়; বরং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়ে ব্রাদারহুড যে নীতি গ্রহণ করেছিল সেটাও ছিল সৌদি আতঙ্কের অন্যতম কারণ। সৌদি রাজতন্ত্রীদের মতে ব্রাদারহুড মিসরীয় সরকারের মাধ্যমে আরব জাহানে বাস্তবধর্মী ও প্রগতিশীল ইসলামকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। মুসলিম ব্রাদারহুড সুন্নী মুসলিম বিশ্বের একটি ব্যাপক জনপ্রিয় দল। তার শাখা প্রশাখা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্বজোড়া বিস্তৃত। তাই সৌদি আরব তাদেরকে ২৫ জানুয়ারীর মূল হোতাদের ছত্রছায়ার অর্ন্তভুক্ত হিসেবে গণ্য করে থাকে। যারা সৌদি আরব ও মিসরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। কারণ উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে উভয় দেশই লাভবান হবে। বিশেষ করে মিসর এই মুহূর্তে একটি গুরুতর নাযুক সময় অতিক্রম করছে। কারণ মিশর বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। মুসলিম ব্রাদারহুড মনে করে এই অবস্থায় রিয়াদ ও কায়রোর সম্পর্ক জোড়দার হলে প্রেসিডেন্ট জেনারেল সিসিকে উৎখাত করার চেষ্টা পর্যুদুস্ত হয়ে যাবে। আর তাই ব্রাদারহুড সমস্ত দল ও সৌদি মিডিয়া ব্যক্তিত্বগণকে নিজেদের পথে কাঁটা মনে করেন। এমনকি যারা নিজেদেরকে মুসলিম ব্রাদারহুড এর বিরোধী মনে করেন তারাও সৌদি মিসরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপারে মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে প্রভাবান্বিত করার চেষ্টা করছে।
সৌদি আরবেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় প্রতি-বিপ্লবে মিসরে ব্রাদারহুড শাসনের ইতি ঘটলেও সৌদি রাজতন্ত্রের ভীতি কাটেনি। উল্টো সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ব্রাদারহুড যে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাতে দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতাই প্রকাশিত হয়েছে এবং সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য এক কালো যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর কারণ ব্রাদারহুডের ঘোর বিরোধী বিভিন্ন জিহাদী সংগঠন পরিস্থিতির কারণে এখন মিসরের অফিসারদের হত্যা করছে এবং সিনাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মিনি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত ব্রাদারহুডকর্মী এবং সিরিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে ফেরত আসা জিহাদীরা যখন একযোগে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেবে তখন সৌদি রাজতন্ত্র তছনছ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সৌদি আরব জানিয়েছে, সিরিয়া থেকে ৬০০ সৌদি জিহাদী ফিরে এসেছেন। কুয়েত বলছে, তার দেশে সিরিয়া ফেরত জিহাদীর সংখ্যা ২০,০০০। সংখ্যা যাই হোক ব্রাদারহুড সমর্থক ও জিহাদীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদের যে হুমকি সৌদি বাদশাহ দিয়েছেন, তাতেই বোঝা যায় এখানে রাজতন্ত্র কতটা হুমকির মুখে।
এই ভীতি থেকেই সৌদি আরব এবং তাদের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো মিসরে শত শত কোটি ডলার ঢালছে এই আশায় যে, মিসরের সর্বশেষ স্বৈরশাসক নিজভূমিতেই ব্রাদারহুডকে বিনাশ করে দিতে সক্ষম হবেন। আরো শত শত কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। মিশরের সামরিক বাহিনী যদি ব্রাদারহুডকে শেষ করে দিতে সক্ষম হয়, তবে সবকিছুই হবে সৌদি পরিকল্পনা মাফিক। তখন সৌদি-ইসরাইল-মিসর জোটের কেন্দ্রবিন্দু হবে। এই জোট আবার আরব জাহানকে ২০১১ সালের আরব বসন্তের পূর্ববর্তী স্বৈরশাসনের যুগে নিয়ে যাবে। সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য সৌদি আরবের নির্দেশে মিসরের সৌদি অর্থায়নপুষ্ট সেনাবাহিনী ইয়েমেন, লিবিয়া ও অন্যান্য দেশে হামলা করতে চায়। চায় ব্রাদারহুডের ঘাঁটি ধ্বংস করে ফেলতে।
আল আরাবিয়্যাহ নেট অবলম্বনে
মুহাম্মাদ শোয়াইব

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন