রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এর সেরা কিছু বানী ।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (জন্ম: ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর, মৃত্যু: ১৯৯১ সালের ২১ জুন) একজন প্রয়াত বাংলাদেশী কবি ও গীতিকার যিনি “প্রতিবাদী রোমান্টিক” হিসাবে খ্যাত। আশির দশকে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠে যে কজন কবি বাংলাদেশী শ্রোতাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি তাদের অন্যতম। তার জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম “বাতাসে লাশের গন্ধ”। এই কবির স্মরণে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মংলার মিঠেখালিতে গড়ে উঠেছে “রুদ্র স্মৃতি সংসদ”।

01. মাখে আকাশের গভীর শান্তি, আমি বসে থাকি প্রিয় আগুনের বেদনার ঘ্রানে প্রতীক্ষমান মহুয়া-মুগ্ধ মাটি !!

02. আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা, প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙ পতাকা ওড়ায়। কথা ছিলো, ‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’, আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন !!

03. আমি যার শিয়রে রোদ্দুর এনে দেবো বলে কথা দিয়েছিলাম সে আঁধার ভালোবেসে রাত্রি হয়েছে । এখন তার কৃষ্ণ পক্ষে ইচ্ছের মেঘ জোনাকির আলোতে স্নান করে, অথচ আমি তাকে তাজা রোদ্দুর দিতে চেয়েছিলাম !!

04. ভালো আছি, ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ !!

05. আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে !!

06. রাজনীতিহীন সাহিত্যচর্চা কপটতা ছাড়া আর কী? !!

07. যে মাঠ থেকে এসেছিল স্বাধীনতার ডাক, সেই মাঠে আজ বসে নেশার হাট !!

08. জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন !!

09. স্বাধীনতা, সে আমার – স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন –স্বাধীনতা – আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল !!

10. আমি একা এই ব্রহ্মান্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা !!

11. আমি কবি নই – শব্দ শ্রমিক শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়, হৃদয়ের কালো বেদনায় !!

12. ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা !!

13. মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে থেকেছে সে পৃথিবীর বয়সের দিকে, আলো আর আঁধারের দিকে, বৃত্তাবদ্ধ জীবনের দিকে। কিছু সে চায়নি তবু, চেয়েছে সে সবচেয়ে বেশি- একখানা গৃহ নয় সারাটা পৃথিবী !!

14. এতোটা নিশব্দে জেগে থাকা যায় না, তবু জেগে আছি আরো কতো শব্দহীন হাঁটবে তুমি, আরো কতো নিভৃত চরনে আমি কি কিছুই শুনবো না- আমি কি কিছুই জানবো না !!

15. ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা !!

15. যে রাত ‘পাশাপশি বসিবার বনলতা সেন’ সে রাত আমার নয়, সে রাত অন্য কারো !!

17. একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবে না !!

18. আমি মস্তিস্কের সমস্ত জানালা খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছি, কেউ আসছে না। না রোদ, না পাখির নেকলেস।
কেবল উত্তর পাহাড়ের হিম, ঠান্ডা হাত ছুঁয়ে যাচ্ছে ব্যথিত চিবুক !!

19. আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ, নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান-ভেজা চোখ, আমাকে গ্রহণ করো।
উৎসব থেকে ফিরে যাওয়া আমি সেই প্রত্যাখ্যান, আমি সেই অনিচ্ছা নির্বাসন বুকে নেওয়া ঘোলাটে চাঁদ।
আমাকে আর কি বেদনা দেখাবে? !!

20. তপ্ত সীসার মতো পুড়ে পুড়ে একদিন কঠিন হয়েছি শেষে, হয়েছি জমাট শীলা। তবু সেই পাথরের অন্তর থেকে কেঁদে ওঠে একরাশ জলের আকুতি, ঝর্ণার মতো তারা নেমে জেতে চায় কিছু মাটির শরীরে !!

21. কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, রাখালেরা পুনর্বার বাশিঁতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বসবে না, চিত্রল তরুণ হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট !!

22. অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল, রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ, বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই- !!

23. কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরন্য, জমিন, আমাদের
পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল- আজন্ম এ জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার !!

24. কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ জমিন অনার্যের হবে। অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের ধারাবাহিকতা কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ। মাতৃভূমি-খন্ডিত দেহের ’পরে তার থাবা বসিয়েছে আর্য বণিকের হাত !!

25. পাখি হয়ে যাই, অথচ খুলতে পারি না দেহের খাঁচা, ডানা ঝাপটাই অভ্যন্তরে স্বপ্নের ডানা নাড়ি !!

26. তবু পৃথিবীতে রাত নামে নিবিড় তুষারের মতো, তুমি শুধু উড়ে চলো ক্লান্তিহীন, তন্দ্রাহীন অন্য এক সকালের দিকে !!

27. তবু তুমিও বলতে পারছো না – না, নেই, কোথাও নেই, আমার কোথাও আজ তার ছায়া নেই, সে নেই কোথাও- বৃষ্টির জলের দাগ মুছে গেছে একদিন সকালের রোদে !!

28. হাত ধরো, হাত ধরো আমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিবর্তে এনে দেবো তৃতীয় পৃথিবীর শ্রেনীহীন কবিতার ভুবন !!

29. জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে- জীবন সুন্দর আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায় !!

30. ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম। তেমনি তোমার নিবিঢ় চলা, মরমের মূল পথ ধরে !!

31. পুষে রাখে যেমন কুসুম, খোলসের আবরণে মুক্তোর ঘুম। তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া, ভিতরের নীল বন্দরে !!

32. ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে, দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায় আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ !!

33. তুমি প্রেমের কলিংবেল টিপে এসে দাঁড়ালে সংশয় সন্দিহান আমি দরোজা খুলেই সরাসরি তোমাকে এনে বসিয়েছি হৃদয়ে। বুকের একান্ত বেডরুমে !!

34. আমার কিছু কথা ছিলো কিছু দুঃখ ছিলো আমার কিছু তুমি ছিলো তোমার কাছে !!

35. এইভাবে এই শূন্য করতলে আমি কি তোমায় লিখেছিলাম তোমার একান্ত নাম ভালোবাসা, কুয়াশার বিনিদ্র শিশির !!

36. আমাদের বাসনায় ছিলো কিছু ভুলবোধ প্রাপ্যের পূর্ণতা তাই এতো মনে হয়
নিঃস্ব করুণ তাই এতো পাওয়াকেও মনে হয় ব্যর্থতা, মনে হয় ম্লান !!

37. কতোখানি ডাক শুনে ছুটে যায় এই মুগ

38. তুমি রেশমী হাতে বুলোতে পরশ রাত্রি নিশ্চুপ হেঁটে যেতো শরীর বেয়ে !!

39. ইচ্ছে ছিলো বিরহের সাথে একরাত কাটাবো নিদ্রায়, যার কাছে ঋনী হয়ে শিখেছি নির্ঘুম রাতের সুখ তার সাথেই একরাত পাশাপাশি কাটাবো গভীর ঘুমে !!

40. মেঘের মেয়ে অতো কাছে এসোনা কোন দিন দিব্যি দিলাম মেঘের বাড়ীর, আকাশ কিংবা আলোর সারির !!

41. বিদায়ের সেহনাই বাজে নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয় সবাইকে অজানা গন্তব্যে হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে !!

42. পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ-খাওয়া একটা সিগারেট প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক। পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে। জ্বলন্ত সিগারেটের স্পর্শ তার দেহে টসটসে আঙুরের মতো ফোস্কা তুলতে লাগলো !!

43. এই সৌরমন্ডলের এই পৃথিবীর এক কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে যে-শিশুর জন্ম । দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের । জ্যোৎস্না যাকে প্লাবিত করে । বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে ।নদীর জোয়াড় যাকে ডাকে নশার ডাকের মতো । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ঔপনিবেশিক জোয়াল
গোলাম বানানোর শিক্ষাযন্ত্র । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক হৃদয়হীন ধর্মের আচার । অথচ যাকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে !!

44. সে এখন মৃত। তার শরীর ঘিরে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত, তাজা লাল রক্ত।
তার থ্যাতলানো একখানা হাত পড়ে আছে এদেশের মানচিত্রের ওপর, আর সে হাত থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের দুর্বিনীত লাভা !!

45. তার দশটি আঙুল-যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ, ভায়ের শরীর,প্রেয়সীর চিবুকের তিল। যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত সাথীর হাত, স্বপ্নবান হাতিয়ার, বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো। সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের জীবন্ত উপমা। লোহার সাঁড়াশি দিয়ে, একটি একটি করে উপড়ে নেয়া হলো তার নির্দোষ নখগুলো। কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ !!

46. তুমি জানো না আমি তো জানি, কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে এতো গান, এতো হাসি নিয়ে বুকে
নিশ্চুপ হয়ে থাকি !!

47. বৈশাখি মেঘ ঢেকেছে আকাশ, পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায় ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ আর কতোদিন? নীল অভিমান পুড়ে একা আর কতোটা জীবন? কতোটা জীবন !!

48. কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই চাই কিছু লাল তীব্র আগুন !!

49. দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি, কোন বেদনার বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত? !!

50. হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা। রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,
আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা !!

51. এই সৌরমন্ডলের এই পৃথিবীর এক কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে যে-শিশুর জন্ম । দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের । জ্যোৎস্না যাকে প্লাবিত করে । বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে । নদীর জোয়াড় যাকে ডাকে নশার ডাকের মতো । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ঔপনিবেশিক জোয়াল
গোলাম বানানোর শিক্ষাযন্ত্র । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক হৃদয়হীন ধর্মের আচার । অথচ যাকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে !!

52. চোখ কি জানে না আঁখিতে কতোটুকু মেঘ জ’মে আছে? কতোটুকু বর্ষার পূর্বাভাস আছে, কতোখানি বর্ষা না-হওয়া গভীর স্তব্ধতা !!

53. দিচ্ছো ভীষণ যন্ত্রণা বুঝতে কেন পাছো না ছাই মানুষ আমি, যন্ত্র না !!

54. চোখ কেড়েছে চোখ উড়িয়ে দিলাম ঝরা পাতার শোক !!

55. আত্মগত আমি আবার নিজের কাছে প্রশ্ন করি নিঃশব্দের এমন রাতে বুকের মাঝে শব্দ কেন? !!

56. কাপড়ে যেমন রোদের গন্ধ তেমনি আমারো শরীরে কিছুটা লেগে আছে প্রিয় আগুনের ঘ্রান বেদনার সুখে !!

57. সুখ কি এমন রোগে অনাহারে পিষ্ট পচন সভ্য পশুর হীন শীৎকার, শুধু চিৎকার শুধু প্রতারনা মিথ্যে মুখোশ, শুধু অপচয়ে আত্মবিনাশ আর কিছু নয় !!

58. সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি সহজে থাকি না কাছে, পাছে বাঁধা পড়ে যাই। বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন-সুতো ধ’রে, আমি শুধু যাই দূরে !!

59. তার দশটি আঙুল-যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ, ভায়ের শরীর, প্রেয়সীর চিবুকের তিল। যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত সাথীর হাত, স্বপ্নবান হাতিয়ার, বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো। সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের জীবন্ত উপমা। লোহার সাঁড়াশি দিয়ে, একটি একটি করে উপড়ে নেয়া হলো তার নির্দোষ নখগুলো। কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ !!

60. আমারও ইচ্ছে করে টুকরো টুকরো কোরে কেটে ফেলি তোমার শরীর !!

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন