জিকিরে মহান আল্লাহকে পাওয়া যায়

জিকিরে মহান আল্লাহর সন্ধান মিলে, তাঁকে পাওয়া যায়। যুগ যুগ ধরে নবী-রাসূলর ও ওলি-আউলিয়ারা জিকিরের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্ধান করেছেন। ধ্যান করেছেন।
ইসলাম ধর্মেও জিকিরের তাৎপর্য অনেক। পীর আউলিয়ারা সর্বদা জিকিরের মাঝেই সময় অতিবাহিত করেন। রাসূল (সা.) এর কাছেও সবচেয়ে প্রিয় আমল ছিল জিকির।

হজরত মুহম্মদ (সা.) ইরাশাদ করেন, ওই সকল কওমের সঙ্গে বসো যারা ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জিকির করে। এটা আমার কাছে ইসমাঈল (আ.) এর চারটি বংশের গোলাম আজাদ করা থেকে বেশি প্রিয়। আর যারা আসর নামাজ থেকে মাগরিব পর্যন্ত আল্লাহর স্মরণ করে তাদের সঙ্গে বসা চারটি গোলাম আজাদ করা থেকে আমার কাছে বেশি প্রিয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১৪)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজর থেকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত জিকিরকারীদের সঙ্গে বসা চারটি গোলাম মুক্ত করা থেকেও উত্তম মনে করতেন। এমনিভাবে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বসাও তার নিকট অধিক প্রিয়। এ কাজ মহান আল্লাহও ভালোবাসেন। অতএব, জিকির মহান রাব্বুল আলামিনের আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় আমল। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার নিকট তোমার ওই আমল বেশি প্রিয় যে (আমলে) তোমার জিহ্বা ভিজা থাকে। (জামে ছগীর)।

নিশ্চয় জিহ্বা চলাচল মানে সে সবসময় জিকির করে। আর নবীজী (সা.) সবসময় মহান আল্লাহর জিকির করতেন। এতএব তিনি জাগ্রত ও ঘুমন্ত এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর জিকির করতেন।

কাপড় পরার সময় ও খোলার সময়, কারো সঙ্গে দেখা ও শোনার সময়, সুস্থ, অসুস্থ সব অবস্থায়। চিন্তা ও পেরেশানীর সময়ে, বিপদে-মুসবিতের সময় ইত্যাদি অবস্থায় তথা সব সময় মহান আল্লাহর জিকির করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর জিকির করতেন। আর তা সকল উম্মতের জন্য সুন্নত করে দিয়েছেন। (সহীহ- বুখারি)

জিকরুল্লাহ বা আল্লাহর স্মরণ কী?

জিকির এর মর্ম হলো আত্মাকে জাগ্রত রাখা, সতর্ক করা। আর জিকিরকে জিহ্বার সঙ্গে সম্পর্কিত করে জিকির নাম রাখা হয়েছে। এজন্য যে, এটা আত্মার সঙ্গে সম্পর্কের বহি:প্রকাশ ঘটায়। কিন্তু যখন জিকিরের প্রভাব যবানের কথার ওপর বেশি হয়ে যায়, তখন সেটা পূর্বের বুঝের মতো হয়ে যাবে। আর আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত জিকির এর উদ্দেশ্য হলো সর্বাবস্থায় এর ওপর অবিচল থাকা। কেউ কেউ বলেন, জিকির হলো শব্দের মাধ্যমে উচ্চারণ করা। এতে উৎসাহ প্রদান করা যাতে স্থায়ী আমলের প্রতি আগ্রহ সর্বদা থাকে।

উত্তম জিকির:

একটি স্থায়ী আমলযোগ্য উত্তম জিকির হলো, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।’

অর্থ: পবিত্রতম আল্লাহ, আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান। অনুরূপ উত্তম জিকির হলো, যেমন: ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, ‘হাসবুনাল্লাহু নিয়মাল ওয়াকিল। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণময় ইসতিগফারের দোয়াসমূহ। আর এ দোয়ার উদ্দশ্য হলো আমলে ওপর অটল থাকা, যা তার ওপর ওয়াবিজ অথবা মুস্তাহাব যেমন, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হাদীসের অধ্যয়ণ। ইলম শিক্ষা করা, নফল নামাজ পড়া। এ মর্মে জিকির কোনো সময় জিহ্বার দ্বারা হয় এবং এর পাঠকারীকে পূর্ণতা এনে দেয়। জিকিরের সঙ্গে অর্থ জানা শর্ত নয়। তবে এ কথা শর্ত যে, এর দ্বারা ভিন্ন অর্থ না বুঝানোই শর্ত। আর যদি জিকিরকে আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক করে নেয়া যায় সেটা হলো অতি পরিপূর্ণ কল্যাণকর।

অবশ্য অর্থ ও মর্ম বুঝে জিকির করা, এতে মহান আল্লাহর মর্যাদা অনুধাবন করা হয় এবং অলসতা আসে না। আর নেক আমলের মধ্যে স্বাদ পাওয়া যায়। নামাজ, জিহাদ ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণতা আসে। আর এটা আরো বেড়ে যায় যদি রাব্বুল আলামিন আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা ও তাওয়াজ্জুহ বৃদ্ধি পায়।

জিকিরের প্রকার:

কেউ কউে বলেন, মহান আল্লাহ তায়ালার জিকির দুই প্রকার।

(১) আত্মার জিকির।

(২) জিহ্বার জিকির।

আত্মার জিকির আবার দুই প্রকার। একটি হলো জিকিরের মধ্যে বড় জিকির তার চিন্তার কারণে। যেমন, মহান আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব, তার মর্যাদা, তার শক্তিমত্তা তার কর্তৃত্ব এবং সাত আসমান ও জমিনে তার নির্দশনাসমূহের মধ্যে যা বলা হয়েছে তার চিন্তা ফিকির করা। যে জিকির আত্মার মাধ্যমে চুপে চুপে করা হয় এবং এর উদ্দেশ্যও তাই।

অপর প্রকারটি হলো, আদেশ ও নিষেধের সময়। অতএব যা আদশে করা হয় তা গ্রহণ ও যা নিষেধ করা হয় তা বর্জন এবং যা মুশকিল হয় তা থেকেও বিরত থাকা।

আর এককভাবে জিহ্বার জিকির সেটা দুর্বল জিকির। কিন্তু তাতে বড় ফজিলত রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জিকির বেশি বেশি কর। (সূরা জুমআ: ৯)

পবিত্র কোরআন হাদীসে জিকিরের ফজিলত:

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদেরকে উত্তম আমলের ব্যাপারে সংবাদ দিব কী? যেটা তোমাদের মালিকের নিকট বেশি প্রিয়। যার মর্তবা অনেক অনেক বেশি এবং সোনা ও রূপা খরচ করা থেকেও উত্তম। আর তোমাদের শত্রুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে উত্তম। অতপর তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত কর এবং তারা তোমার ঘাড়ে আঘাত করে। তারা বলল, হ্যাঁ! নবীজী (সা.) বললেন, তা হলো আল্লাহর জিকির। মুআজ বিন জাবাল (রা.) বলেন, আল্লাহর জিকির ছাড়া অন্য কোনো জিনিস তার আজাব থেকে বাঁচাতে পারবে না। (সুনানে তিরমিযী ২৬৮৮)

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। (সূরা আরাফ ৭:২০৫)

অর্থাৎ তুমি নিজে নিজে আল্লাহর জিকির গোপনে ও নিজের সঙ্গে এবং আল্লাহর ভয়ে করো। সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার নিজের কানে শোনার মত করে। এবং অন্যেরা না শুনে এমনভাবে জিকির কর। আর আল্লাহর জিকির থেকে অসলদের মতো হয়ো না। এ কথার দ্বারা সকাল-সন্ধ্যা জিকির করার জন্য বান্দাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যাতে তারা অলস না হয়। মুহম্মদ (সা.) ইরাশাদ করেন, যে তার প্রভুর জিকির করে আর যে করে না তাদের উদাহরণ জিন্দা ও মুর্দারের ন্যায়। (বুখারি, কিতাবুত দাওয়াত, অধ্যায়: ফজলু জিকরিল্লাহ)

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতের মধ্যে জিকিরের ফজিলত বর্ণনা করেছেন। জিকির করার আদশে দিয়েছেন। জিকির থেকে বিরত থাকা হতে নিষেধ করেছেন। জিকির না করা হলো অলসতা। অধিক জিকিরের দ্বারা সফলতা পাওয়া যায়। এছাড়াও জিকিরকারীর জন্য প্রশংসা ও উত্তম প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে।

আর জিকির সব কিছু থেকে বড়। কেননা, আমলের সমাপ্তি এর দ্বারা ঘটে। আর তার দ্বারা রোজার আমলের পূর্ণতা হয় এবং এর দ্বারা হজ সমাপ্তি হয়। জিকির দ্বারা সালাত ও জুমা শেষ হয়।

জিকিরের বৈশিষ্ট্য:

জিকিরের বৈশিষ্ট্য হলো, সকল ইবাদতের সঙ্গে এর বন্ধুত্ব রয়েছে। আর নফলের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এবং এটা সকল ইবাদতের আত্মা। কেননা, মহান আল্লাহ তায়ালা জিকিরকে সালাত, রোজা, হজ, কোরবানি ইত্যাদির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। বরং এটা হজের আত্মা এবং হজের উদ্দেশ্য ও সারাংশ এবং এ জিকিরকে জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতেও তার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামের সময়ও জিকিরের নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এজন্য আমি নিশ্চয় বলে থাকি ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।’ যখন থেকে সূর্য উদয় হয় তখন থেকে এর জিকির করা আমার নিকট অধিক প্রিয়। (মুসলিম, কিতাবুল জিকির)

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন